সন্ধ্যার আকাশে বিষখালী নদী রঙিন


দৈনিক সিরাজগঞ্জ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুলাই ১১, ২০২৩, ১২:৪০ অপরাহ্ন /
সন্ধ্যার আকাশে বিষখালী নদী রঙিন

আজকালের কন্ঠ ডেস্ক : সেদিন সন্ধ্যার আকাশে কালো মেঘের দল নদীর ভুকে ছায়া ফেলিয়া চলিয়াছিল। বৃষ্টি পড়িতেছে না বটে,

কিন্তু পশ্চিম হইতে খর আদ্ৰ বায়ু বহিতেছে–শীঘ্রই বৃষ্টি নামিবে। ছিন্ন ধাবমান মেঘের আড়ালে পঞ্চমীর চন্দ্ৰকলা মাঝে মাঝে দেখা যাইতেছে–যেন মহাকালের করুচ্যুত বিষাণ খসিয়া পড়িতেছে, এখনই দিগন্তরালে অদৃশ্য হইবে।

নদীর পূর্বতটে উজ্জয়িনীর পাষাণ-নির্মিত বিস্তৃত ঘাট। ঘাটের অসংখ্য সোপান বহু ঊর্ধ্ব হইতে ধাপে ধাপে নামিয়া নদীর গর্ভে প্রবেশ করিয়াছে, ক্ষিপ্ৰ জল-ধারা এই পাষাণ প্ৰতিবন্ধকে আছাড়িয়া পড়িয়া আবর্ত সৃষ্টি করিয়া বহিয়া যাইতেছে। কিন্তু শূন্য ঘাটে আজ নদীর আক্ষেপোক্তি শুনিবার কেহ নাই।

ঘাট নির্জন । অন্যদিন এই সময় বহু স্নানার্থিনীর ভিড় লাগিয়া থাকে; তাহদের কলহাস্য ও কঙ্কণ কিঙ্কিণী মুখরভাবে শিপ্রাকে উপহাস করিতে থাকে; তাহাদের ঘটোচ্ছিলিত জল মসৃণ সোপানকে পিচ্ছিল করিয়া তোলে। আজ কিন্তু ভিড় নাই। মাঝে মাঝে দুই একটি তরুণী বধু আকাশের দিকে সশঙ্ক দৃষ্টি হানিয়া ঘট ভরিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিতেছে। ক্কচিৎ এক ঝাঁক কিশোরী দল বেধে কলশী নিয়ে জল ভরিতে আসিতেছে; তাহারাও অল্পকাল জলক্রীড়া করিয়া পূৰ্ণঘট-কক্ষে চঞ্চল-চরণে সোপান আরোহণ করিয়া প্ৰস্থান করিতেছে। নির্জন ঘাটে সন্ধ্যার ছায়া আরও ঘনীভূত হইতেছে।

ঘাট নির্জন বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ জনশূন্য নহে। একটি পুরুষ নিম্নতর সোপানের এক প্রান্তে চিন্তামগ্ন ভাবে নীরবে বসিয়া আছেন। পুরুষের বয়স বোধ হয় পয়ত্ৰিশ কিংবা ছত্রিশ বৎসর হইবে।–যৌবনের মধ্যাহ্ন।

দেহের বর্ণ তপ্তকাঞ্চনের ন্যায়, মস্তক মুণ্ডিত, স্কন্ধে উপবীত, ললাটে শ্বেত চন্দনের ত্রিপুণ্ডক। মেঘাচ্ছন্ন প্রাবৃটি-সন্ধ্যার সময় তাঁহার উজ্জ্বল চক্ষু স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। তিনি কখনও আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছেন, কখনও উদ্বেল-যৌবনা নদীর তরঙ্গ-ভঙ্গ নিরীক্ষণ করিতেছেন, কখনও ক্রীড়া-চপলা, তরুণীদের রহস্যালাপ শ্রবণ করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছেন।

কিন্তু তাঁহার মুখ চিন্তাক্রান্ত। হয়তো বা পরিবারের অভাব অনাটন’ র কথা চিন্তা করছেন ; কিন্তু তাঁহার প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাওয়া যায় নাই। নানা দুশ্চিন্তায় দুভাবনায় এই মধুর আষাঢ় মাসেও রাত্রিতে নিদ্রা নাই! হয়তো বা ঘড়ে রোগাক্রান্ত স্ত্রী রয়েছে।

কয়েকটি যুবতী এই সময় হাসিতে হাসিতে জলের ধারে নামিয়া আসিল। পুরুষকে কেহ লক্ষ্য করিল না–উত্তরীয় কলস নামাইয়া রাখিয়া জলে অবতরণ করিল; কৌতুক-সরস আলাপ করিতে করিতে পরস্পরের দেহে জল ছিটাইতে লাগিল। পুরুষ একবার স্ব চোখে তাহাদের প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া তাহাদের আলাপচারি শুনিতে লাগিলেন।

এদিকে জেলেরা নদীতে জাল ফেলিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে, বিষখালীর মাছ আহরন করিবার আশায়। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় ভেলা ভাসিয়ে ভরসি ফেলে মনের সুখে গান ধরেছে এই জেলেরা। এদিকে সূর্য্যি মামা প্রায় অস্ত যাবে, তার রঙিন কিরোণ নদীতে মনে হয় বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়েছে। সবাই তখন ঘড়ে ফেরায় ব্যস্থ হয়ে পড়েছে। রাখালের গাভী ছানা এদিক সেদিক দৌড়ে পালাচ্ছে, এ যেন প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে। এমনি সময় দেখা যায় নদীতে কচুরিপানার উপরে একটি সাদা পালকের বক, ভাসতে ভাসতে যাইতেছে; হয়তো ঠিকানা বিহীন এই পলক কোথায় যাবে তা তার নিজেরও যানা নেই।